loader image for Bangladeshinfo

ব্রেকিং নিউজ

  • করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ইব্রাহিমোভিচ

  • পাবনা-৪ আসনে উপনির্বাচন

  • স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে: ডিএসসিসি মেয়র

  • জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ প্রদান দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকেট

  • ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৯তম প্রয়াণ দিবস


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৯তম প্রয়াণ দিবস

বাঙালি সুখে-দুঃখে বারবার ফিরে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেই। বাঙালির এমন কোনো অনুভূতি নেই – যার প্রকাশ ঘটেনি রবি ঠাকুরের সৃজনকর্মে। বিশ্বজুড়ে যখন কোভিড-১৯ মহামারি চলছে, তখনও প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ। জীবদ্দশায় তিনি প্লেগ, ম্যালেরিয়া প্রভৃতির বীভৎস রূপ দেখেছেন। প্লেগ সচেতনতায় রাস্তায় নেমেছিলেন। যুক্ত হয়েছিলেন হাসপাতাল নির্মাণ-কাজে। আর যা লিখেছিলেন – তা এখনো প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন, ‘ম্যালেরিয়া-প্লেগ-দুর্ভিক্ষ কেবল উপলক্ষমাত্র, তাহারা বাহ্য লক্ষণমাত্র; মূল ব্যাধি দেশের মজ্জার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে।’ করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এবার পালন করা হবে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিকী। আজ বৃহস্পতিবার, ২২ শ্রাবণ কবিগুরুর ৭৯তম প্রয়াণ দিবস।

আজ ২২শে শ্রাবণ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৯তম প্রয়াণ দিবস। মহাকালের চেনাপথ ধরে প্রতিবছরই বাইশে শ্রাবণ আসে। এই বাইশে শ্রাবণ বিশ্বব্যাপী রবি-ভক্তদের কাছে একটি বিশেষ দিন, কারণ, এদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর দিন। রবীন্দ্রকাব্যের বিশাল একটি অংশে যে-পরমার্থের সন্ধান করেছিলেন, সেই পরমার্থের সাথে তিনি লীন হয়েছিলেন এদিন। 

রবীন্দ্রকাব্যে মৃত্যু এসেছে বিভিন্নভাবে। জীবদ্দশায় মৃত্যুকে তিনি জয় করেছেন বারবার। কাব্য-কবিতায় মৃত্যু-বন্দনা করেছেন তিনি এভাবে – ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান। মেঘবরণ তুঝ, মেঘ জটাজুট! রক্তকমলকর, রক্ত-অধরপুট, তাপ বিমোচন করুণ কোর তব মৃত্যু-অমৃত করে দান।’

জীবনের শেষ নববর্ষের সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সাধের শান্তিনিকেতনে। সেদিন তাঁর কলমে রচিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংকট’ নামের অমূল্য প্রবন্ধটি। তারও ক’দিন পর ১৯৪১ সালেরই ১৩ মে লিখে রাখলেন, রোগশয্যায় শুয়েই – ‘আমারই জন্মদিন মাঝে আমি হারা’।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলোতে কখনও তিনি শয্যাশায়ী, কখনও মন্দের ভালো। শেষের দিকে ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই, শান্তি নিকেতনের আশ্রম বালক-বালিকাদের ভোরের সঙ্গীতঅর্ঘ্য তিনি গ্রহণ করেন তাঁর উদয়ন গৃহের পূর্বের জানলার কাছে বসে। উদয়নের প্রবেশদ্বার থেকে ছেলেমেয়েরা গেয়ে ওঠে কবিরই লেখা – ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল আজ’।

রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ‘রবীন্দ্র জীবনকথা‘য় কবির মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন। তিনি লিখেন: শান্তি নিকেতনে কবি এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দেহ আর চলছিল না। চিকিৎসা সেবারও ত্রুটি নেই। অবশেষে ডাক্তাররা পরামর্শ করে ঠিক করলেন – অপারেশন ছাড়া উপায় নেই।

৯ শ্রাবণ (২৫ জুলাই) শান্তিনিকেতন থেকে কবিকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হলো । শান্তি নিকেতনের সাথে ৭০ বছরের স্মৃতি জড়িত। কবি কী বুঝতে পেরেছিলেন – এই তাঁর শেষ যাত্রা? যাবার সময় চোখে রুমাল দিচ্ছেন দেখা গেছে।

৩০ জুলাই, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কবির শরীরে অস্ত্রোপচার হলো। তার কিছু আগে শেষ কবিতা রচনা করেন ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি, বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী।’

চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করলে তা নিস্ফল হয়। অবস্থা দ্রুত মন্দের দিকে যেতে লাগলো; জ্ঞান হারালেন। শেষ নিঃশ্বাস পড়লো রাখীপূর্ণিমার দিন মধ্যাহ্নে; বঙ্গাব্দ ১৩৪৮ সালের ২২ শে শ্রাবণ, খ্রিস্টাব্দ ১৯৪১-এর ৭ অগাস্ট কবি চলে গেলেন অমৃতলোকে।

রবীন্দ্রভক্তরা যেমন বাইশে শ্রাবণে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় কবিকে স্মরণ করেন, ভক্তি-অর্চনা জানান, তেমনি কবির জীবনেও ছিল একটি বাইশে শ্রাবণ। সেই বাইশে শ্রাবণের জ্বালা নিয়ে কবিকে পার করতে হয়েছে বছরের পর বছর। তুষের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন কবি। কবির জীবনেও বাইশে শ্রাবণ একটি মৃত্যুর দিন। কবির সবচেয়ে প্রিয় দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথের আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ ছিল সেই বাইশে শ্রাবণের দিনে।

যদিও এই মৃত্যু প্রথম নয়। নিজের জীবদ্দশায় আঙিনা দিয়ে মৃত্যুশোকের যে-দীর্ঘ মিছিল শুরু হয়েছিল – দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথের মৃত্যু ছিল মিছিলের শেষ বিন্দু। ইতোপূর্বে শোকের ঝড়ে উৎসবের প্রদীপ নিভে গেছে বারবার। আগেই দুই মেয়ে বেলা এবং রেনু অকালে চলে গিয়েছিলেন। আর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে মৃত্যু ঘটে তাঁর মায়ের।

মা সারদা দেবী ছিলেন নিষ্ঠাবতী বৈষ্ণবী, ধর্মমতী। সাত বছর বয়সে সাতপাঁকে বাঁধা পড়েন। দেবেন্দ্রনাথের বয়স তখন সতেরো। অল্পবয়সেই প্রথম সন্তানের জননী। তারপর একে একে পনেরোটি সন্তানের গর্ভধারিণী।

‘জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ মায়ের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘যে রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতে ছিলাম। তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল – ‘ওরে তোদের কী সর্বনাশ হলো রে’। স্তিমিত প্রদীপে অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল। কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতে পারিলাম না। প্রভাতে বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান।’

রবীন্দ্রনাথের বিয়ের দিনেও মৃত্যু হানা দিতে ভুল করেনি। ঠাকুর-পরিবারের বিয়েতে পালকি চড়ে পাত্রীকেই আসতে হতো পাত্রের বাড়িতে। সেই বিয়ের দিনেই ঘটে এক অঘটন। রবীন্দ্রনাথের দিদি সৌদামিনীর স্বামী সারদা প্রসাদ ছিলেন ঘরজামাই। ছোট ভাইয়ের বিয়ের দিনেই কপালের সিদুঁর আর হাতের শাঁখা দুটি হারালেন সৌদামিনী। আর তখনো পালকিতে বসে সালঙ্কারা মৃণালিনী দেবী।

না, মৃত্যু এখানে এসেও থেমে থাকেনি, এবার আরেক ট্রাজেডি; বিয়ের পরে চার মাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই তাঁর নতুন বৌঠান, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের রূপবতী স্ত্রী কাদম্বরী দেবী পূর্ণ যুবতী অবস্থায় আত্মহত্যা করেন।

এরপরে আবারও কবি-পরিবারে মৃত্যুর আগমন। মৃত্যু এসে আরেকজনের শিয়রে দাঁড়ায়। মাত্র আটাশ বছর বয়সে (মতান্তরে ত্রিশ) কবি-পত্নীরও মৃত্যু হয়। তার আগে প্রথম সন্তান বেলার জন্ম হয় ১৮৮৮ সালে। তারপর সেজো মেয়ে রেনু এবং ছোট মেয়ে মীরা। এতোদিনে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর বিষয়টি হজম করে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন। ১৯০১ সালে বড় মেয়ে বেলার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের অল্প কিছুদিন পরেই বেলার মৃত্যু হয়। এবার মৃত্যু এসে ডাক দিয়ে যায় সেজো মেয়ে রেনুর জীবনেও।

রবীন্দ্রনাথের থাকে আর একটি মাত্র মেয়ে মীরা দেবী। মীরার বর নগেন্দ্রনাথ ছিলেন ঠাকুরবাড়ির ঘরজামাই। এই ঘরে বংশ-প্রদীপ জ্বেলে রেখেছিলো একমাত্র পুত্র নীতিন্দ্রনাথ। স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রনাথের স্নেহাস্পদের স্থানে ছিল এই নীতিন্দ্রনাথ। তাঁর বয়স যখন সবেমাত্র কুড়ি, অস্ফূট জীবনের কুঁড়ি যখন বিকশিত হবে, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পাঠান বিলেতে। উন্নত ধরনের ছাপার কাজ ও প্রকাশন শিল্পের জ্ঞান অর্জন করে দেশে ফিরবে নীতিন্দ্রনাথ – এই প্রত্যাশাই ছিলো কবির।

কিন্তু নিয়তির আরেক পরিহাস, বিলেতেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন নীতিন্দ্রনাথ। যক্ষ্ণারোগের জীবাণুগুলো আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরেছে নীতিন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথের মুখের উৎকন্ঠার আঁচগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। এই কালব্যাধির খবর শুনে বিচলিত হয়ে ছুটে আসেন নীতিন্দ্রনাথের বাবা নগেন্দ্রনাথ, সাথে মা মীরা দেবী। ডাক্তার-ওষুধ ও চিকিৎসার জন্য অকাতরে অর্থ দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সাথে উৎকন্ঠা আর উদ্বেগ।

২১ শ্রাবণ ৬ অগাস্ট মৃত্যুর সমন পৌঁছে যায় নীতিন্দ্রনাথের শিয়রে। ডাক্তারদের নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকেন তিনি। পরদিন বাইশে শ্রাবণ ১৩৩৯, ৭ অগাস্ট ১৯৩২, মৃত্যই জিতে যায়; শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নীতিন্দ্রনাথ। প্রিয় দৌহিত্রের মৃত্যুদিবস বাইশে শ্রাবণকে ধারণ করে কবিও বিদায় নেন আরেক বাইশে শ্রাবণে। (সংকলিত)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জীবনে সাহিত্যের এমন বিচিত্র এক জগৎ রচনা করেছেন, যা বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের আসরে করেছে মহিমান্বিত। বিপুল তাঁর রচনা, বিচিত্র তাঁর বিষয়। তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই ফলেছে রাশি রাশি সোনা। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সংগীত, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র, সমালোচনা, চিত্রকলা সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর অজস্র অনন্য সৃষ্টিতে। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য তাঁর নোবেলপ্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে বিরল গৌরব এনে দেয়। 

শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় নয়, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থনীতি নিয়ে স্বকীয় ভাবনাও তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও গণশিক্ষার যে-অগ্রযাত্রা আমরা এখন লক্ষ্য করি, রবীন্দ্রনাথ সেই সময় নওগাঁর পতিসর ও কুষ্টিয়ার শিলাইদহে, পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে সে-ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। গরিব কৃষক-প্রজার কল্যাণে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষি সমবায় ব্যাংক। পরে নোবেল পুরস্কারের টাকার একটি অংশও এই ব্যাংকে যোগ করেছিলেন। 

ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দেশজ আদর্শ লালিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই অনন্য ব্যক্তিত্ব, যাঁর লেখা গান বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে মনোনীত হয়েছে। 

করোনা-পরিস্থিতির কারণে ২২শে শ্রাবণ উপলক্ষে এবার তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নেই। তবে বাঙালি মননের চিরনবীন এই সারথির প্রয়াণ দিবসে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সমন্বয় পরিষদ ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। রবীন্দ্র স্মরণের এই উৎসবে আজ কোনো শিল্পীর কণ্ঠে উৎসারিত হবে হয়তো অমিয় সুরের ধারা, যেখানে ধ্বনিত হবে, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা...’।

Loading...